নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীতে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে সাম্প্রতিক আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শ্রমিক লীগ নেতা হিসেবে পরিচিত রহমত উল্লাহ ওরফে ‘কাইল্লা রহমতের’ বিরুদ্ধে উসকানি ও অর্থায়নের অভিযোগ উঠেছে। বিসিকের কয়েকজন ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, আন্দোলনকে সহিংস রূপ দিতে তাঁর অনুসারীদের একটি অংশ সক্রিয় ছিল এবং এ কাজে অর্থের জোগানও দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে অনীহা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও
বাসিন্দাদের ভাষ্য, ফতুল্লার বিসিক শিল্পাঞ্চলে ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক
প্রভাব বিস্তার নিয়ে আগে থেকেই আলোচনায় ছিলেন রহমত উল্লাহ। তাঁদের অভিযোগ, আওয়ামী
লীগ সরকারের সময়ে তিনি তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তাঁর ভাতিজা আজমেরী
ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ওই সময় শিল্পাঞ্চলের ঝুট ব্যবসাসহ বিভিন্ন
কর্মকাণ্ডে তাঁর প্রভাব ছিল বলে দাবি স্থানীয়দের। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রহমত
উল্লাহর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চলতি নভেম্বরের
শুরুতে ফতুল্লার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার
টাকা নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। কয়েক দিনের কর্মসূচিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ
সংযোগ সড়কসহ শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে
সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং
যান চলাচল ও কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
এসব ঘটনায় রাজনৈতিক
উসকানি ও নাশকতার অভিযোগে ফতুল্লা মডেল থানায় দুটি মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মামলাগুলোতে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আসামি
করা হলেও রহমত উল্লাহর নাম নেই। এ নিয়ে বিসিকের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সূত্র
প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও স্থানীয় প্রভাবের কারণে তিনি
মামলার বাইরে রয়েছেন। তবে মামলার এজাহার ও তদন্তের নথি যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত
সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
নাম প্রকাশ না করার
শর্তে বিসিক শিল্পনগরীর কয়েকজন ব্যবসায়ী ও শ্রমিক দাবি করেন, শ্রমিক আন্দোলনের সময়
রহমত উল্লাহর অনুসারীদের একটি অংশ সক্রিয় ছিল। তাঁদের অভিযোগ, আন্দোলনকে
অস্থিতিশীল করতে উসকানি দেওয়ার পাশাপাশি অর্থের জোগানও দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতার সঙ্গে তাঁর সখ্য রয়েছে উল্লেখ করে তাঁরা আরও দাবি
করেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি স্থানীয়ভাবে প্রভাব ধরে রেখেছেন।
স্থানীয় কয়েকটি
সূত্রের অভিযোগ, রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে রহমত উল্লাহ নিজের অবস্থান ধরে
রেখেছেন। শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে দায়ের করা মামলায় তাঁর নাম না থাকার পেছনেও এ ধরনের
যোগাযোগ ভূমিকা রেখেছে বলে তাঁদের ধারণা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ
সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতাদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
এদিকে শ্রমিকদের
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন এবং আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনাগুলো পৃথকভাবে
তদন্তের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনের সঙ্গে
সহিংসতা বা নাশকতার অভিযোগকে এক করে দেখা উচিত নয়। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা
গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে উসকানি, অর্থায়ন কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পরিস্থিতি
অস্থিতিশীল করেছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জেলা
পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, “শ্রমিক আন্দোলনকে ঘিরে উসকানিদাতা ও
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে অর্থের জোগানদাতাদের বিষয়ে বেশকিছু তথ্য গোয়েন্দা নজরদারিতে
উঠে এসেছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক ইউনিট কাজ
করছে। ইতোমধ্যে রূপগঞ্জে ছাত্রলীগের একজন নেতা আন্দোলনে বিশৃঙ্খলা করতে লোক
সাপ্লাই দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। অন্যদের বিষয়েও একই ধরনের আইনগত
ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে রহমত উল্লাহর
বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁর নাম উল্লেখ করে কোনো বক্তব্য
পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা, আন্দোলনে তাঁর বা তাঁর অনুসারীদের ভূমিকা এবং
অর্থায়নের বিষয়ে তদন্তের ফলাফলই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশের আগে জরুরি
যাচাই: রহমত উল্লাহর বক্তব্য নেওয়া, দুটি মামলার এজাহার ও আসামির তালিকা যাচাই করা
এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের বক্তব্যটি রেকর্ড বা নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করা
প্রয়োজন। বিশেষ করে গোয়েন্দা নজরদারিতে তাঁর নাম রয়েছে” বা “রাজনৈতিক প্রভাবে
মামলা থেকে বাদ পড়েছেনএ ধরনের দাবি প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করবেন
না।
মন্তব্য করুন