রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু রোগীদের চিকিৎসায় দেখা দিয়েছে তীব্র শয্যা সংকট। ৬০ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ শিশু। জায়গার অভাবে ওয়ার্ডের বাইরে, করিডোর ও মেঝেতেও চলছে চিকিৎসা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, হাম, ডেঙ্গু, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশুদের অনেক ক্ষেত্রে একই এলাকায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে হাসপাতাল থেকেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মুগদা
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।
হাসপাতালের ৮ তলার শিশু ওয়ার্ডের নবজাতক ওয়ার্ড-১-এর সামনে ঘণ্টার
পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিলেন রোগীর স্বজনরা। তাঁদের একজন মো. মাইনুদ্দীন। তাঁর কোলে ছিল
আট মাস বয়সী শিশু জাবের। শরীরে র্যাশ দেখা দেওয়ায় পরিবারের সন্দেহ, শিশুটি হামে আক্রান্ত।
কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তারা কোনো শয্যা পাননি।
শ্বাসকষ্টে শিশুটি ছটফট করলেও তখন পর্যন্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা হয়নি
বলে জানান তার স্বজনরা। একটি শয্যার জন্য কখনো নার্সদের কক্ষে, কখনো চিকিৎসকদের কক্ষে
ছুটছিলেন বাবা। তবে প্রতিবারই অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছিল।
এদিকে জাবেরের পাশ দিয়েই যাতায়াত করছিলেন নবজাতকসহ অন্যান্য রোগীর
স্বজনরা। একই জায়গায় ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশুরাও চিকিৎসা নিতে আসছিল।
ফলে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুর সঙ্গে অন্য শিশুদের অনিচ্ছাকৃত সংস্পর্শের ঝুঁকি
তৈরি হচ্ছিল।
শিশু ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা মেডিকেল অফিসার ডা. নুশরাত জাহান জানান,
৬০ শয্যার এই ওয়ার্ডে প্রায় সবসময় ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী ভর্তি থাকে। হাম, ডেঙ্গু, নিউমোনিয়াসহ
বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা চলছে এখানে।
তিনি বলেন, হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড থাকলেও সেখানে বর্তমানে কোনো শয্যা
খালি নেই। একইভাবে ডেঙ্গু ওয়ার্ডেও রোগীর চাপ বেশি। ফলে নির্ধারিত ওয়ার্ডের বাইরে অন্য
জায়গাতেও রোগীদের রাখতে হচ্ছে।
বিকেলের শিফটে ২৭০ শিশুর চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন মাত্র দুইজন মেডিকেল
অফিসার ও তিনজন নার্স।
ডা. নুশরাত বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের অন্য রোগীদের সংস্পর্শে না
আসতে অভিভাবকদের বারবার বলা হচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং জায়গার সংকটে তা
সবসময় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিশু ওয়ার্ডের পাশাপাশি ডেঙ্গু ওয়ার্ডেও তীব্র শয্যা সংকট দেখা গেছে।
কুমিল্লার হোমনা থেকে তিন বছরের বাইজিদকে নিয়ে মুগদা হাসপাতালে আসেন বাবা জিলানি। হাসপাতালে
আসার পর একদিন পেরিয়ে গেলেও ডেঙ্গু ওয়ার্ডে শয্যা মেলেনি। শেষ পর্যন্ত ওয়ার্ডের বাইরের
মেঝেতে কাপড় বিছিয়ে শিশুটিকে রাখা হয়। মাথার ওপর ফ্যানও ছিল না। মা শিল্পী খানম হাতপাখা
দিয়ে ছেলেকে বাতাস করছিলেন।
আরেক শিশু আইরিনকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চার দিন মেঝেতে থাকতে
হয়েছে বলে জানান তাঁর বাবা মাসুদ আহমেদ। পরে শয্যা পেলেও ওয়ার্ডের অতিরিক্ত গরমে শিশুটির
অস্থিরতা বেড়ে যায় বলে জানান তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে মুগদা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের মেঝেতে চিকিৎসা দেওয়ার
চিত্রও উঠে এসেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অতিরিক্ত রোগীর কারণে প্রত্যেক রোগীর
জন্য আলাদা শয্যা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত
শিশুদের পাশাপাশি নবজাতকদেরও অবস্থান করতে হচ্ছে। কোথাও পর্দা দিয়ে সামান্য আলাদা করার
চেষ্টা করা হলেও তা যথেষ্ট নয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়ায় আক্রান্ত
রোগীকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা জরুরি। বিশেষ করে নবজাতক ও অন্যান্য অসুস্থ শিশুদের
সংস্পর্শে হাম ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুন
নাহার বলেন, শয্যা সংকটের কারণে একই শয্যায় একাধিক শিশু থাকার ফলে হামের সংক্রমণ বাড়ছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য আইসোলেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এআরএফের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও কক্সবাজারের
কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া হাম আক্রান্ত শিশুদের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে
উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকেই সংক্রমিত হয়েছে বলে
গবেষণায় উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতাল যদি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জায়গা না হয়ে সংক্রমণের
উৎসে পরিণত হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর)
সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, হাসপাতালগুলোতে
হাম রোগীদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীদের উপজেলা
ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. মো. নুরুল
ইসলাম বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গু ও হামের রোগী বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি
হয়েছে। এর ফলে শিশুদের হাসপাতালেই হাম, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি
তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকট রয়েছে। এ কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও
রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকার জনবল সংকট মোকাবিলায় কাজ
করছে।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগীর চাপ কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে
চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, হাসপাতালগুলোতে পৃথক আইসোলেশন ব্যবস্থা বাড়ানো এবং সংক্রমণ
নিয়ন্ত্রণের নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করা জরুরি। অন্যথায় অতিরিক্ত রোগীর চাপের সঙ্গে হাসপাতালভিত্তিক
সংক্রমণের ঝুঁকিও আরও বাড়তে পারে।
শয্যা সংকট এবং একই ওয়ার্ডে হাম-ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার বিষয়টি উঠে
এসেছে।
দ্যা প্রেস নিজ/এসআর
মন্তব্য করুন