দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের পর প্রায় দুই বছর পর নতুন নেতৃত্ব পেয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হেফাজতে ইসলাম। তবে নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়েও সংগঠনটির দীর্ঘদিনের বিভক্তি পুরোপুরি কাটেনি। নতুন কমিটি ঘোষণার অনুষ্ঠানেও বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মীদের অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
রাজনৈতিক
সংগঠন হিসেবে সরাসরি পরিচয় না থাকলেও দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ধর্মভিত্তিক
সংগঠন হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জের কার্যক্রম গত কয়েক বছরে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে
পড়ে। সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যকার বিরোধ, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও একাধিক পক্ষের
অবস্থানকে এ নিষ্ক্রিয়তার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার
(২৬ আগস্ট) বিকেলে নগরের ডিআইটি রেলওয়ে কলোনী জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত এক সভা শেষে
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর শাখার আংশিক কমিটি ঘোষণা করা
হয়। কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশিরউল্লাহ নতুন কমিটির নেতাদের নাম ঘোষণা
করেন।
ঘোষিত
জেলা কমিটিতে ডিআইটি রেলওয়ে কলোনী জামে মসজিদের খতিব ও হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয়
নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে সভাপতি করা হয়েছে। এর আগেও তিনি নারায়ণগঞ্জ
জেলা হেফাজতের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।
জেলা
কমিটিতে আমলাপাড়া মাদরাসার মাওলানা আব্দুল কাদেরকে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এবং মাদানীনগর
মাদরাসার মুফতি বশিরউল্লাহকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। এ ছাড়া যুগ্ম সাধারণ
সম্পাদক হিসেবে মাওলানা বদিউল আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে মাওলানা মহিউদ্দিন খান
(সোনারগাঁ), অর্থ সম্পাদক হিসেবে মাওলানা খোরশেদ আলম কাসেমী এবং প্রচার সম্পাদক
হিসেবে মুফতি শেখ শিব্বিরের নাম ঘোষণা করা হয়।
অন্যদিকে,
মহানগর হেফাজতের সভাপতি করা হয়েছে মুফতি জাকির হোসেন কাসেমীকে। সাধারণ সম্পাদক
হয়েছেন দেওভোগ মাদরাসার মাওলানা আব্দুর রহমান। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মুফতি
মামুনুর রশীদ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে মাওলানা মাহমুদ ইবনে আউয়ালের নাম ঘোষণা
করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয়
সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশিরউল্লাহ জানান, পরবর্তীতে আরও সদস্য যুক্ত করে জেলা ও
মহানগর শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে।
আগের কমিটি ঘিরে শুরু বিরোধ
নারায়ণগঞ্জ
হেফাজতের বর্তমান বিভক্তির সূত্রপাত হয় আগের কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। ২০২৪
সালের ৪ অক্টোবর নগরের চাষাঢ়ার বাগে জান্নাত জামে মসজিদে প্রতিনিধি সম্মেলনের
মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হেফাজতের কমিটি ঘোষণা করেছিলেন সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ
যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব।
তবে ওই
সম্মেলনে মাওলানা আব্দুল আউয়ালসহ নারায়ণগঞ্জের হেফাজতের একটি বড় অংশের নেতারা
উপস্থিত ছিলেন না।
সেসময়
ঘোষিত জেলা কমিটিতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে
সভাপতি এবং খেলাফত মজলিসের নেতা এবিএম সিরাজুল মামুনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
মহানগর কমিটিতে সভাপতি করা হয় মুফতি হারুনুর রশিদকে এবং সাধারণ সম্পাদক করা হয়
মাওলানা মীর আহমাদুল্লাহকে।
তবে কমিটি
ঘোষণার পরপরই বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নাম ঘোষণা
করা হলেও এবিএম সিরাজুল মামুন দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং ঘোষিত কমিটি
প্রত্যাখ্যান করেন।
তৎকালীন
এক বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেছিলেন, মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে জেলা কমিটির মূল
দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং জেলা ও মহানগরের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের মতামত
উপেক্ষা করে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।
পরে
মাওলানা মামুনুল হকসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি প্রতিনিধি দল নারায়ণগঞ্জের ডিআইটি
মসজিদে এসে উভয় পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরবর্তীতে প্রতিনিধি সম্মেলনে ঘোষিত কমিটি
স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
ফেরদাউসুর রহমানকে ঘিরেও দ্বন্দ্ব
নারায়ণগঞ্জ
হেফাজতের অভ্যন্তরীণ বিরোধের আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের
নেতা মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান। তিনি এর আগে নারায়ণগঞ্জ মহানগর হেফাজতের সভাপতির
দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০২৪
সালের প্রতিনিধি সম্মেলন ও কমিটি ঘোষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তিনি অন্যতম
ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওসমান পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার অভিযোগকে
কেন্দ্র করে হেফাজতের একটি অংশ তার বিরোধিতা করে আসছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার
বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত ৫
আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সংগঠনের অভ্যন্তরীণ এই বিরোধ আরও প্রকাশ্যে
আসে। হেফাজতের একাংশ তাকে সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে
উল্লেখ করে তার বিরোধিতা করে আসছে।
এর মধ্যেই
গত ৩০ সেপ্টেম্বর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও মহানগর হেফাজতের
সাবেক প্রচার সম্পাদক জাহিদ হাসান হামলার শিকার হন। ওই ঘটনায় তিনি মাওলানা
ফেরদাউসুর রহমানসহ হেফাজতের কয়েকজন নেতাকে দায়ী করেছিলেন।
নতুন কমিটি, পুরোনো বিভক্তি
হেফাজতের
অভ্যন্তরীণ বিভক্তির চিত্র ২০২৪ সালের প্রতিনিধি সম্মেলনেও স্পষ্ট হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকে সেখানে উপস্থিত থাকলেও নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা সংগঠনটির
দুই নায়েবে আমীরের কেউই ওই সম্মেলনে অংশ নেননি।
বুধবার
নতুন কমিটি ঘোষণার অনুষ্ঠানেও আগের কমিটিকে কেন্দ্র করে বিরোধী অবস্থানে থাকা
নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। ফলে নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম
নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুরোনো বিরোধ ও বিভক্তি নিরসন হবে কি না, তা
নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে।
এখন নতুন
নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে—দীর্ঘদিনের বিভক্তি কাটিয়ে
সংগঠনের বিভিন্ন পক্ষকে এক ছাতার নিচে আনা এবং নারায়ণগঞ্জে হেফাজতে ইসলামের
সাংগঠনিক কার্যক্রম আবারও সক্রিয় করা।
দ্যা প্রেস নিউজ/এসআর
মন্তব্য করুন