আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি। দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সংগঠনকে নতুন করে সাজিয়ে তৃণমূলকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। একইসঙ্গে সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রেখে জনগণের সমর্থন নিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে জয়ী হতে চায় বিএনপি।
নির্বাচন কমিশন
আগামী সেপ্টেম্বর থেকে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের
প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিন স্তরের এই নির্বাচনকে তাই বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে
বিএনপি। দলের লক্ষ্য শুধু নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করা নয়, এর
মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক দুর্বলতাও কাটিয়ে ওঠা।
বিএনপির সাংগঠনিক
কাঠামোর বড় একটি সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দীর্ঘদিন
ধরে কাউন্সিল না হওয়াকে। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে গত দেড় দশকে তৃণমূল পর্যায়ে
দলটির স্বাভাবিক কার্যক্রম অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ফলে দেশের বিভিন্ন
জেলা ও উপজেলায় বছরের পর বছর একই নেতৃত্ব দায়িত্ব পালন করে আসছেন। কোথাও কোথাও এক
যুগেরও বেশি সময় ধরে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন আসেনি। এতে নতুন
নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সুযোগ কমেছে এবং অনেক এলাকায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলও বেড়েছে।
নিয়মিত কাউন্সিল না
হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় কেন্দ্রের প্রভাবশালী নেতাদের মাধ্যমে কমিটি গঠনের অভিযোগও
রয়েছে। এতে দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও সক্রিয় নেতাকর্মীদের অনেকে পিছিয়ে পড়েছেন বলে মনে
করছেন দলের সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হয়েছে একাধিক উপদল ও নেতৃত্বের
দ্বন্দ্ব।
আসন্ন স্থানীয়
সরকার নির্বাচনের আগে এসব সমস্যা কাটিয়ে সংগঠনকে সক্রিয় করতে চায় বিএনপির
হাইকমান্ড। দলীয় সূত্রের দাবি, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই দেশের বিভিন্ন জেলা ও
উপজেলা পর্যায়ের কাউন্সিল শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি সূত্র
জানায়, এবার ওপর থেকে কমিটি চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তৃণমূলের কাউন্সিলরদের মতামতের
ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সরাসরি কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন
নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
বিগত
আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা, এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি
রয়েছে—এমন নেতাদের নেতৃত্বে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ও
দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের সামনে নিয়ে আসতে চায় দলটি।
বিএনপির নেতারা মনে
করছেন, স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় ও ঐক্যবদ্ধ সংগঠন গড়ে
তুলতে পারলে ভোটের মাঠেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
স্থানীয় সরকার
নির্বাচনে বিএনপির জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বিদ্রোহী প্রার্থী।
অতীতে কেন্দ্র থেকে একজনকে দলীয় সমর্থন বা মনোনয়ন দেওয়ার পরও দলের একাধিক নেতা
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এতে দলীয় ভোট বিভক্ত হয়ে
প্রতিপক্ষ প্রার্থী সুবিধা পেয়েছেন।
এবার এই পরিস্থিতি
এড়াতে কঠোর অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে
কেউ প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
দলীয় সূত্রের দাবি,
তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে যে প্রার্থীকে চূড়ান্ত করা হবে, তার বাইরে গিয়ে অন্য
কেউ প্রার্থী হলে সেটিকে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এমনকি
নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া বা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ পাওয়া
গেলেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপির স্থায়ী
কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দল সর্বোচ্চ
গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। নির্বাচনে দলের পক্ষ থেকে একক প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।
দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ প্রার্থী হলে তার অতীত পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক
প্রভাব বিবেচনায় না নিয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক
বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপির জন্য শুধু জনপ্রতিনিধি
নির্বাচনের বিষয় নয়; বরং দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে দলটির মাঠপর্যায়ের
সাংগঠনিক সক্ষমতা ও জনসমর্থন যাচাইয়েরও বড় সুযোগ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
অধ্যাপক গোলাম হাফিজের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে গতানুগতিক প্রশাসনিক
প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার পর ক্ষমতায় থাকা
বিএনপির জন্য এটি গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের অন্যতম বড়
ক্ষেত্র হতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামাল দেওয়া এবং
বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করাই বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তবে দলটি যদি
স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী নির্বাচন করতে পারে, তাহলে
নির্বাচনে ভালো ফল করার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, স্থানীয়
সরকার নির্বাচন বিএনপির জন্য একদিকে যেমন সাংগঠনিক পুনর্গঠনের সুযোগ, অন্যদিকে
তেমনি জনপ্রিয়তা ও তৃণমূলের ওপর নিয়ন্ত্রণের বড় পরীক্ষা। দলটি শেষ পর্যন্ত কতটা
ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে নামতে পারে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে ভোটের মাঠে তাদের
সাফল্য।
দ্যা প্রেস নিউজ/এসআর
মন্তব্য করুন