নারায়ণগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযানে শুধু মাদকসেবীদের গ্রেপ্তার করে
সমস্যার সমাধান হবে না বলে মন্তব্য করেছেন নবাগত পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান।
মাদকের উৎস,
সরবরাহকারী এবং যারা কারবারিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে মাদক নির্মূলে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে
গণমাধ্যম, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন
পুলিশ সুপার।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে
সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
মাদক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, মাদকের
চাহিদা থাকায় এর সরবরাহও তৈরি হচ্ছে। এ কারণে মাদকসেবীদের পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার
বিরুদ্ধেও কার্যকর অভিযান প্রয়োজন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের অভিযানের
কারণে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির প্রবণতা কমেছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন,
মাদক কারবারিদের পেছনে যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে, তাদেরও চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে
ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা
হচ্ছে।
হাবিবুর রহমান বলেন, শুধু মাদকসেবী গ্রেপ্তার করলে
মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। মাদক সরবরাহকারীদের বিষয়ে সঠিক তথ্য পেলে তা পুলিশকে
জানানোর আহ্বান জানান তিনি। এসব তথ্য পুলিশের গোয়েন্দা ব্যবস্থার মাধ্যমে যাচাই
করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান।
তবে পুলিশের কাছে আসা প্রতিটি অভিযোগ যাচাই ছাড়া আমলে নেওয়া হয় না
বলে সতর্ক করেন পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, জমিজমা কিংবা ব্যবসায়িক বিরোধের
কারণে অনেক সময় প্রতিপক্ষকে হয়রানি করতে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর অভিযোগ দেওয়া হতে
পারে। সামনে নির্বাচন থাকায় এ ধরনের বিরোধ আরও তৈরি হতে পারে। তাই অভিযোগ পাওয়ার
পর তা যাচাই-বাছাই করেই আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মাদক মামলার আইনগত প্রক্রিয়া নিয়েও কথা বলেন তিনি। তার ভাষ্য, মাদকসহ
কাউকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানোর পর পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম আদালতের
এখতিয়ার। আবার অল্প পরিমাণ মাদকসহ গ্রেপ্তারের ঘটনায় মামলার সংখ্যা বাড়লে তদন্তে
পুলিশ সদস্য ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়।
এ পরিস্থিতিতে মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে মোবাইল
কোর্টের পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বড় মাদক কারবারিদের ক্ষেত্রে তাদের অর্থের উৎস ও আর্থিক কর্মকাণ্ড শনাক্ত করে
আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন পুলিশ সুপার।
মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ড যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে
মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন হাবিবুর রহমান।
তিনি বলেন,
একজন মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর পর নির্দিষ্ট
সময় শেষে সে আবার একই কাজে ফিরে গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এতে বারবার
গ্রেপ্তার ও মুক্তির একটি চক্র তৈরি হবে।
এ জন্য মাদক নিরাময়কেন্দ্র, সংশোধনমূলক কার্যক্রম ও
পুনর্বাসনব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনেও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার
সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জেলা পুলিশের নতুন এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন,
যানজট নিয়ন্ত্রণ পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এর সঙ্গে সিটি
করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জেলা পরিষদ, বিআরটিএ, সড়ক ও জনপথসহ একাধিক সংস্থা যুক্ত। তাই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করতে হবে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ইতোমধ্যে কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি
কমিটি করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপের
মাধ্যমে অন্তত যানজটকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।
অটোরিকশা ও গ্যারেজ ব্যবস্থাপনার বিষয়েও নজরদারি বাড়ানোর কথা
জানান পুলিশ সুপার। গ্যারেজ বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে সেগুলোতে কারা অবস্থান করছে, ভাড়াটিয়া
ও ভাসমান লোকজন কারা—এসব তথ্য সংগ্রহ করে পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, অভিযোগ
পাওয়ার পর পুলিশ কাউকে আটক করলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মামলা করতে না
চাইলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়।
তবে কোনো ঘটনা আইন অনুযায়ী আমলযোগ্য অপরাধ হলে পুলিশ দ্রুত
ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থাকেও আরও স্বচ্ছ করার কথা জানান হাবিবুর
রহমান। বিতর্কিত কিংবা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের কমিউনিটি
পুলিশিং কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
জেলা প্রশাসন ও পুলিশের মধ্যে সুসম্পর্ক এবং পারস্পরিক সমন্বয়
বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান।
তিনি বলেন,
প্রশাসনের কোনো পর্যায়ে কে বড় বা কে ছোট—এ ধরনের বিষয়কে
প্রাধান্য না দিয়ে প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালন করবেন। তবে জেলার
সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় জরুরি।
ডিসি ও এসপির মধ্যে কোনো ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হলে এর নেতিবাচক
প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জকে আইনশৃঙ্খলার দিক থেকে শান্তিপূর্ণ জেলা হিসেবে গড়ে
তুলতে সবার সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন উল্লেখ করে পুলিশ সুপার বলেন, পুলিশ,
প্রশাসন, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলেই
কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব।
মতবিনিময়
সভায় নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবু সাউদ মাসুদের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ
সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টির সঞ্চালনায় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন
কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দ্যা প্রেস নিউজ/এফজে
মন্তব্য করুন