চলতি বছরের বাকি সাড়ে তিন মাসের জ্বালানি চাহিদা পূরণে ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকার পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চীন ও ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এসব জ্বালানি তেল কেনা হবে। একই সময়ে দরপত্র ছাড়াই আরও ৬ লাখ ৯৫ হাজার টন গ্যাস ওয়েল ও জেট ফুয়েল কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে
পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির একাধিক ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। একই দিনে অর্থনৈতিক
বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে দরপত্র ছাড়া জ্বালানি কেনার বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন
দেওয়া হয়।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, চীনের ইউনিপেক ও পেট্রো চায়না এবং ইন্দোনেশিয়ার
বিএসপি থেকে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা
হবে। এসব জ্বালানি কেনায় সরকারের ব্যয় হবে ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা।
তবে কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কী পরিমাণ জ্বালানি কেনা হবে, সে বিষয়ে অর্থ
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।
জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে এতদিন জিটুজি চুক্তি ও আন্তর্জাতিক
দরপত্রের মাধ্যমে ৫০:৫০ অনুপাতে কেনার একটি শর্ত ছিল। বুধবারের বৈঠকে বিশেষ পরিস্থিতি
বিবেচনায় সেই শর্ত শিথিল করা হয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট দেশ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জিটুজি
চুক্তির আওতায় সরাসরি জ্বালানি কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, একই সময়ের জন্য দরপত্র ছাড়াই ৬ লাখ ৯৫ হাজার টন গ্যাস ওয়েল
ও জেট ফুয়েল কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা
কমিটির বৈঠকে। সাধারণত দরপত্র ছাড়া সরাসরি পণ্য বা সেবা কেনার ক্ষেত্রে এ কমিটির নীতিগত
অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যেই সরকারের এ সিদ্ধান্ত
এলো। পশ্চিম এশিয়ার চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা
তৈরি হয়েছে। আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ ও মজুদ কমে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি চাহিদা পূরণে
সরকারকে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এর আগে একই পরিস্থিতিতে দরপত্র ছাড়াই ১৮ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক
গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
গত আগস্টেও দুই দফায় দরপত্র ছাড়া মোট ২২ কার্গো এলএনজি আমদানির অনুমোদন
দেওয়া হয়। ১৯ আগস্টের বৈঠকে সাতটি কোম্পানি থেকে দুটি করে মোট ১৪ কার্গো এলএনজি কেনার
সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
এর আগে ৬ আগস্টের বৈঠকে দরপত্র ছাড়াই আট কার্গো এলএনজি আমদানির অনুমোদন
দেওয়া হয়। একই বৈঠকে দেশের ‘আপৎকালীন’ এলপিজি চাহিদা পূরণ এবং বাজারে সরবরাহ ও স্থিতিশীলতা
নিশ্চিত করতে ৫ হাজার টন এলপিজি আমদানির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায়
নিয়ে বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করছে সরকার। পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে
জাহাজ চলাচল নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা এ ক্ষেত্রে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় ছয় মাস ধরে কার্যত বন্ধ থাকার পরিস্থিতির
পাশাপাশি সম্প্রতি ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধাদের পক্ষ থেকে মান্দেব প্রণালী নিয়েও হুমকি
তৈরি হয়েছে। ফলে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে ঝুঁকি বেড়েছে।
এ অবস্থায় দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে পশ্চিম এশিয়ার
বাইরের উৎস থেকেও জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে
জ্বালানি কেনার পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে দরপত্র ছাড়াই সরাসরি আমদানির পথও বেছে নিতে
হচ্ছে।
চলতি বছরের শেষ সাড়ে তিন মাসের চাহিদা পূরণে পরিশোধিত জ্বালানি তেল
আমদানির সর্বশেষ সিদ্ধান্তকে এমন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যেই দেশের জ্বালানি সরবরাহ
অব্যাহত রাখার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দ্যা প্রেস নিজ/এসআর
মন্তব্য করুন