সম্প্রতি বিএনপির একটি অনুষ্ঠানে আতাউর রহমান মুকুলের বক্তব্য এবং
তার জবাবে আবুল কালামের ছেলে সাবেক কাউন্সিলর আবুল কাউসার আশার মন্তব্য ঘিরে
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরে মুকুলের ছেলে রেজানুর রহমানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের
একটি পোস্টও এ আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দলীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, কালাম ও মুকুলের মধ্যে দূরত্ব
তৈরি হলেও তা দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে আসেনি। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে
সেই সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন শুরু হয়। ওই নির্বাচনে দুইবারের সাবেক চেয়ারম্যান
আতাউর রহমান মুকুল প্রার্থী হলেও আবুল কালাম ও তার ছেলে আবুল কাউসার আশার কাছ থেকে
প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি বলে দলীয় সূত্রগুলো দাবি করছে।
বন্দর উপজেলা পরিষদের ওই নির্বাচনে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায়
সাবেক দুই চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল ও এমএ রশীদকে পেছনে ফেলে জয় পান মুছাপুর
ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন। মুকুলের অনুসারী নেতা-কর্মীরা তার সঙ্গে
থাকলেও কালাম পরিবারের ঘনিষ্ঠদের বড় একটি অংশ নির্বাচনে সক্রিয় ছিলেন না বলে
সংশ্লিষ্টরা জানান।
নির্বাচনের পর বন্দর এলাকায় আতাউর রহমান মুকুল শারীরিকভাবে
লাঞ্ছিত ও হামলার শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় কালাম পরিবারের ভূমিকা ও
অবস্থান নিয়ে মুকুলের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয় বলে তার ঘনিষ্ঠদের দাবি।
অন্যদিকে,
গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবুল কালাম
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও তার নির্বাচনী প্রচারে আতাউর রহমান মুকুলকে
তেমন সক্রিয় দেখা যায়নি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণে এটিও ছিল উল্লেখযোগ্য
পরিবর্তন বলে মনে করছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা।
রাজনৈতিকভাবে আবুল কালাম ও আতাউর রহমান মুকুলের সম্পর্ক ছিল
দীর্ঘদিনের। আবুল কালাম নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি। তার বাবা হাজী
জালাল উদ্দিনও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সংসদ সদস্য ছিলেন। আবুল কালাম এর আগে
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
আগের নির্বাচনী সময়গুলোতে ভাই আবুল কালামের পক্ষে অনুসারীদের নিয়ে
মাঠে সক্রিয় ছিলেন আতাউর রহমান মুকুল। একইভাবে মুকুল যখন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে
প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন,
তখন তার পাশে ছিল আবুল কালামের সমর্থন।
এমনকি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে আবুল কালামের
ছেলে আবুল কাউসার আশা কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার সময়ও মুকুলকে তার পাশে দেখা
গেছে। সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক সমন্বয়ের জায়গায় গত উপজেলা নির্বাচন থেকেই দৃশ্যমান
পরিবর্তন এসেছে।
সম্পর্কের এই টানাপোড়েন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে বিএনপির
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ৮ সেপ্টেম্বর নগরীর আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগারে
আয়োজিত আলোচনা সভায়। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানসহ দলের
প্রবীণ নেতাদের উপস্থিতিতে দেওয়া বক্তব্যে নিজের রাজনৈতিক বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন
আতাউর রহমান মুকুল।
তিনি বলেন,
দীর্ঘদিন তিনি এমন একজনের রাজনৈতিক ছায়ায় ছিলেন, যাকে পিতৃতুল্য মনে করতেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির জন্য তিনি নিজের রাজনৈতিক জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং দলের
কমান্ডের চেয়েও তার নির্দেশকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই ব্যক্তিই তার
বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছেন এবং তাকে বিভিন্ন সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে
অভিযোগ করেন মুকুল।
একই বক্তব্যে তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও স্পষ্ট অবস্থান
জানান। মুকুল বলেন,
এখন থেকে তিনি নিজের নামেই পরিচিত হতে চান এবং বিএনপির একজন
সাধারণ কর্মী হিসেবেই রাজনীতি চালিয়ে যেতে চান।
মুকুলের বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানান
আবুল কালামের ছেলে আবুল কাউসার আশা। এক অনুষ্ঠানে তিনি মুকুলের ‘কালো হাতের ছায়া’
মন্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ওই ‘কালো হাত’ কার—তা স্পষ্ট করার আহ্বান জানান।
আশার বক্তব্য, রাজনৈতিক জীবনে মুকুল বিভিন্ন সময় বিভিন্ন
রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি দাবি করেন, একসময়
মুকুল আবুল কালামের ভাই হিসেবে পরিচিত ছিলেন, আবার ওসমান
পরিবারের সঙ্গেও তার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ছিল।
উপজেলা নির্বাচনে জনগণই মুকুল সম্পর্কে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে
দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন আশা। একই সঙ্গে রাজনীতিতে ‘মুনাফেক চরিত্রের’ ব্যক্তিদের
বয়কট করার কথা বলেন তিনি।
আবুল কাউসার আশা যখন এসব বক্তব্য দেন, তখন তার
পাশে সংসদ সদস্য আবুল কালামও উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে,
পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের
অবস্থান তুলে ধরেছেন আতাউর রহমান মুকুলের ছেলে রেজানুর রহমান। দীর্ঘ এক স্ট্যাটাসে
তিনি তার বাবার রাজনৈতিক ভূমিকার বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পাশাপাশি কয়েকজন রাজনৈতিক
নেতার কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন।
স্ট্যাটাসের শেষাংশে তিনি লেখেন—‘মেরুদণ্ড
সোজা রেখেছি, বাঁকা করিনি।’
দীর্ঘদিনের
রাজনৈতিক মিত্রতা,
পারিবারিক সম্পর্ক এবং দলীয় রাজনীতির সমীকরণে নতুন করে তৈরি হওয়া
এই দূরত্ব এখন স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রকাশ্য
বক্তব্যের এই পাল্টাপাল্টি ভবিষ্যতে কালাম-মুকুল পরিবারের রাজনৈতিক সম্পর্ককে কোন
দিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই এখন নজর স্থানীয় নেতাকর্মীদের।
দ্যা প্রেস নিউজ/এফজে
মন্তব্য করুন