নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে মৃতের সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে। সোমবার সকালে দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৯০৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২৪৭ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ৩২০ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বন্যা ও
পাহাড়ি ঢলের পর সোমবার পঞ্চম দিনে পড়েছে উদ্ধার অভিযান। দুর্গম এলাকাগুলোতে এখনও
বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। একই সঙ্গে কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে
থাকা মরদেহ উদ্ধারে উদ্ধারকারী দলকে ব্যাপক বেগ পেতে হচ্ছে।
নেপালের
অন্তত আটটি জেলা এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে চিতোয়ান
জেলা থেকে সর্বোচ্চ ২৭২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নওয়ালপারসি পূর্বে ২০৭টি,
নওয়ালপারসি পশ্চিমে ১৫১টি এবং গোর্খায় ৬২টি মরদেহ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া
নুয়াকোটে ৯৫টি, ধাদিঙে ৫৫টি, তানাহুতে ৩৭টি এবং রাসুয়ায় ২৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বিশেষ করে
রাসুয়া এলাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বুধবার সকালে ভোটেকোশি নদীতে
আকস্মিকভাবে পানি ও কাদার প্রবল স্রোত নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে ওই স্রোত আশপাশের
জনবসতিতে আঘাত হানে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। প্রবল স্রোতে অনেক মরদেহ মূল
ঘটনাস্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ভেসে যাওয়ায় সেগুলো শনাক্ত ও উদ্ধার করা কঠিন
হয়ে পড়েছে।
উদ্ধার
করা মরদেহগুলোর বড় একটি অংশের পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অনেক মরদেহের
অবস্থা এতটাই নাজুক যে স্বাভাবিকভাবে দেখে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এ কারণে
কর্তৃপক্ষ ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছে।
এদিকে
মরদেহ সংরক্ষণ নিয়েও নতুন সংকটে পড়েছে নেপাল। দেশটির বিভিন্ন মর্গে ধারণক্ষমতার
চেয়ে বেশি মরদেহ জমা হওয়ায় জায়গার সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু
ভবন অস্থায়ীভাবে মরদেহ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘ সময় মরদেহ
সংরক্ষণের মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় সরকার মরদেহের প্রয়োজনীয় তথ্য ও নমুনা
সংরক্ষণের পর গণকবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নেপালের
পাশাপাশি সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত অঞ্চলও আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কবলে
পড়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে এই দুর্যোগে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নিখোঁজ রয়েছেন ৫৪৭ জন।
নিখোঁজদের
মধ্যে ৪৯ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে বেইজিং। তাদের সবাই তামিলনাড়ুর
বাসিন্দা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তামিলনাড়ুর
একটি পর্যটন সংস্থা জানিয়েছে, তাদের পরিচালিত ৪৯ সদস্যের একটি পর্যটকদল কৈলাস-মানস
সরোবর ভ্রমণে গিয়েছিল। বুধবারের দুর্যোগের পর থেকে দলটির সদস্যদের সঙ্গে আর
যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে
কলকাতা থেকে নেপালে যাওয়া একটি পর্যটকদলেরও কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। ওই দলে
৩২ জন সদস্য ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের মোট ৩৭ জনের খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি বলে জানা
গেছে।
নিখোঁজ
ভারতীয়দের সবাই যে পর্যটক, তা নয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নেপালের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ
প্রকল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। আকস্মিক বন্যার পর নেপালের সেনা ও পুলিশ
সদস্যদের মধ্য থেকেও কয়েকজনের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ভয়াবহ এই
দুর্যোগের পর নেপালের বিভিন্ন হাসপাতাল ও উদ্ধারকেন্দ্রে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে
মানুষের ভিড় বাড়ছে। দূর-দূরান্ত থেকে পরিবারগুলো হাসপাতালে ছুটে আসছেন প্রিয়জনের
কোনো খবর পাওয়ার আশায়।
একদিকে
বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধার, অন্যদিকে হাজারো মানুষের নিখোঁজ থাকার ঘটনায় দেশটির
প্রশাসনের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। দুর্গম এলাকা, কাদামাটির স্তর ও বিচ্ছিন্ন
যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উদ্ধার অভিযানও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ
বলছে, নিখোঁজদের সন্ধান এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মরদেহ উদ্ধারে অভিযান
অব্যাহত রয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র পেতে আরও সময় লাগতে পারে।
দ্যা প্রেস নিজ/এসআর
মন্তব্য করুন