নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ১৪
বছর বয়সী সাঁওতাল কিশোরী রিয়া সরেনের মৃত্যুকে ঘিরে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়েছে
পরিবারের মধ্যে। গত ৭ সেপ্টেম্বর একটি ভাড়া বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ
অপমৃত্যুর মামলা করলেও কয়েক দিন পর রিয়ার পরিবার দাবি করেছে, এটি
আত্মহত্যা নয়, তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
পরিবারের অভিযোগ, তারা
ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে মামলা করতে চাইলেও পুলিশ তা নেয়নি। তবে পুলিশের
বক্তব্য, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে হত্যার আলামত পাওয়া গেলে
সে অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রিয়া সরেনের বাড়ি দিনাজপুরের
নবাবগঞ্জ উপজেলায়। পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে মা
রিবিকা মুরমুর সঙ্গে রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালী এলাকায় একটি ভাড়া
বাসায় ওঠে রিয়া। প্রায় দুই মাস আগে তার মা দিনাজপুরে ফিরে গেলেও রিয়া ওই বাসায় থেকে
যায়।
স্থানীয় একটি বহুজাতিক
প্রতিষ্ঠানের প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কারখানায় অস্থায়ীভাবে কাজ করত রিয়া। তার মা
রিবিকা মুরমুও একই কারখানায় কাজ করেছেন বলে জানা গেছে।
রিয়ার নানা বাবুরাম মুরমুর
ভাষ্য, ৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে বাড়িওয়ালী তানিয়া ফোন করে জানান, রিয়া ‘স্ট্রোক’ করেছে। খবর পেয়ে তারা দিনাজপুর থেকে রূপগঞ্জের উদ্দেশে
রওনা দেন। পরদিন সকালে রূপগঞ্জে পৌঁছে থানায় গেলে তারা জানতে পারেন, রিয়া গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।
ময়নাতদন্ত শেষে ওইদিনই
পরিবারের সদস্যরা মরদেহ নিয়ে দিনাজপুরে ফিরে যান এবং দাফন সম্পন্ন করেন। পরে
বাড়িওয়ালীর দেওয়া প্রাথমিক তথ্য এবং পুলিশের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে
পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ তৈরি হয় বলে জানান তারা।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর)
পরিবারের সদস্যরা রূপগঞ্জ থানায় গিয়ে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে মামলা করার
উদ্যোগ নেন। এ সময় বাড়িওয়ালী তানিয়া ও তার স্বামী জুয়েলকে সন্দেহের কথা জানান
তারা।
বাবুরাম মুরমু বলেন, মৃত্যুর
আগের রাতেও রিয়ার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের ফোনে কথা হয়েছিল। তখন তার আচরণে
আত্মহত্যার কোনো ইঙ্গিত তারা পাননি। বরং রিয়াকে বিদেশে পাঠানোর জন্য পাসপোর্ট করার
কথাও বলা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তবে পরিবারের অভিযোগ
অস্বীকার করেছেন বাড়িওয়ালী তানিয়া। তাঁর দাবি, রিয়ার মৃত্যুর খবর শুনে পরিবারের
সদস্যরা ভেঙে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি শুরুতে ‘স্ট্রোক’ হওয়ার কথা
জানিয়েছিলেন। পরিবারের লোকজন আসতে দেরি করায় তিনিই ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর
দেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তানিয়া আরও জানান, প্রায়
দুই বছর ধরে রিয়া তার বাসায় থাকত এবং তিনি তাকে নিজের মেয়ের মতো দেখতেন। রিয়ার এক
বান্ধবী প্রথম তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায় বলেও দাবি করেন তিনি। রিয়াকে ওই
কারখানায় কাজ পেতে সহযোগিতা করার কথাও জানান তানিয়া।
রিয়ার পরিবারের সঙ্গে
দিনাজপুর থেকে রূপগঞ্জে আসা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমবায় সমিতির সভাপতি মিকায়েল টুডু
বলেন, মরদেহে গলায় কালো দাগ ও কানের পাশে রক্তের চিহ্ন দেখেছেন তারা। মৃত্যুর
বিষয়ে বিভিন্নজনের কাছ থেকে ভিন্ন তথ্য পাওয়ায় পরিবারের সন্দেহ তৈরি হয়েছে বলে
জানান তিনি।
এদিকে ৯৯৯ নম্বরে কল পাওয়ার
পর ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন রূপগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক
(এসআই) নাহিদ মাসুম। পরিবারের দাবি অনুযায়ী রিয়ার বয়স ১৪ বছর হলেও সুরতহাল
প্রতিবেদনে বয়স ২০ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।
এসআই নাহিদ মাসুম বলেন, প্রাথমিকভাবে
পাওয়া আলামতের ভিত্তিতে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে ধারণা হওয়ায় অপমৃত্যুর মামলা করা
হয়েছিল। তবে আত্মহত্যার পেছনের কারণ তখন নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভবিষ্যৎ তদন্তের
বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম
সালাউদ্দিন বলেন,
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের
অপেক্ষা করতে হবে। প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে। যদি
ময়নাতদন্তে হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সে
অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দ্যা প্রেস নিউজ/এফজে
মন্তব্য করুন